চিতাভস্ম ভারতে ফেরানোর দাবিতে
নেতাজির তথাকথিত কন্যা অনিতা বসু ফাফের আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের নোটিস: ফের সামনে ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর রহস্য
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত কথিত ভস্মাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তাঁর তথাকথিত কন্যা অনিতা বসু ফাফ-এর করা আবেদনে ১১ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী ড. অভিষেক মনু সিংভি।
সুপ্রিম কোর্ট এখনও কোনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি যে রেনকোজি মন্দিরের ভস্মাবশেষ নেতাজির। আদালত নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর তত্ত্বকেও স্বীকৃতি দেয়নি। ১১ আগস্টের পদক্ষেপ ছিল কেন্দ্রের কাছে নোটিস জারি করে এই আবেদনের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য জানতে চাওয়া।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে কী দাবি?
আবেদনে রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত কথিত ভস্মাবশেষ ও অস্থিকলসের যথাযথ সংরক্ষণ, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে জাপান সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, একটি আন্তঃমন্ত্রক কমিটি গঠন এবং কথিত দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির দাবিও জানানো হয়েছে।
এখন কেন্দ্রকে এই দাবিগুলির বিষয়ে আদালতের সামনে তার অবস্থান জানাতে হবে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন—
যে ভস্মাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি করা হচ্ছে, সেটি কি সত্যিই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই বিতর্ক।
১৮ আগস্ট ১৯৪৫: নেতাজির সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?
প্রচলিত বিতর্কিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ তাইহোকু বিমানবন্দরের কাছে একটি বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু এই তত্ত্ব কখনও সর্বসম্মত ছিল না।
নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত হয়েছে। ১৯৫৬ সালের শাহনওয়াজ কমিটি এবং ১৯৭০ সালের বিচারপতি জি. ডি. খোসলা কমিশন বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকে সমর্থন করেছিল।
এরপর ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার বিচারপতি এম. কে. মুখার্জির নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করে।
মুখার্জি কমিশনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
মুখার্জি কমিশনের তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নেতাজির কথিত বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত ভস্মাবশেষের পরিচয়।
২০০৫ সালে কমিশন তার রিপোর্ট জমা দেয়।
কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল—
১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর কথিত বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়নি।
এবং—
রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত ভস্মাবশেষ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নয়।
এটি নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্ত।
তবে একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হল—ভারত সরকার মুখার্জি কমিশনের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
অতএব, সঠিক ঐতিহাসিক অবস্থান হল: মুখার্জি কমিশন এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, কিন্তু ভারত সরকার সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল।
রেনকোজির ভস্মাবশেষ নিয়ে প্রশ্ন
রেনকোজি মন্দিরে একটি ভস্মাবশেষ সংরক্ষিত রয়েছে—এটি নথিভুক্ত ঘটনা।
দাবীদার পক্ষের দীর্ঘদিনের বক্তব্য, সেটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভস্মাবশেষ।
অন্যদিকে, মুখার্জি কমিশন বলেছে সেটি নেতাজির নয়।
ফলে “রেনকোজির ভস্মাবশেষ নেতাজির” এটি সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত দাবি।
DNA পরীক্ষা—সমাধান, না নতুন প্রশ্ন?
রেনকোজির ভস্মাবশেষের DNA পরীক্ষা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—রেনকোজির ভস্মাবশেষের এমন কোনও চূড়ান্ত DNA পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়নি, যার ভিত্তিতে সর্বসম্মতভাবে প্রমাণ করা যায় যে ওই ভস্মাবশেষ নেতাজির।
বিশিষ্ট নেতাজি গবেষক ড. জয়ন্ত চৌধুরী এই ভস্মাবশেষের DNA পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ, ভস্মাবশেষের উৎস এবং অতীতে সেটির সংরক্ষণ বা স্থানান্তর নিয়ে থাকা প্রশ্নগুলির কারণে বর্তমান নমুনার DNA পরীক্ষা করলেও সেটিকে নেতাজির পরিচয়ের চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে।
ড. চৌধুরীর দীর্ঘদিনের গবেষণার পরে তিনি মনে করেন , ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি এবং সেই তত্ত্বকে ভিত্তি করে রেনকোজির ভস্মাবশেষকে নেতাজির বলে ধরে নেওয়াই ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
১১ আগস্ট ২০২৬—সুপ্রিম কোর্ট আসলে কী করল?
এখানেই বর্তমান ঘটনার গুরুত্ব।
সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে এবং এই আবেদনের বিষয়ে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য কি হবে, এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার আদালতের সামনে কী নথি পেশ করে, মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট সম্পর্কে কী অবস্থান নেয়, রেনকোজির ভস্মাবশেষের পরিচয় সম্পর্কে কী বলে এবং ভস্মাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত জানায়—সেদিকেই এখন নজর।
৮১ বছর পরেও প্রশ্ন একই
নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের কেন্দ্রে আজও দুটি প্রশ্ন, যে প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় পুরো দেশ তথা বিশ্ব, ১৯৪৫ সালের পর কি হয়েছিলো? কোথায় ছিলেন আমাদের দেশনায়ক!!!