"আমি সেই সৌভাগ্যবান মানুষদের মধ্যে নই, যাঁরা নেতাজির নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্যেক ভারতীয়ের হৃদয়ে নেতাজির একটি অম্লান প্রতিচ্ছবি রয়েছে... নেতাজি ছিলেন দেশপ্রেমের জীবন্ত প্রতিমূর্তি... ইংরেজরা যে ভারতীয় সৈন্যদের শক্তির ওপর ভর করে ভারত শাসন করত, নেতাজি সেই ভারতীয় শক্তিকেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদের শিকড়ে এক প্রবল আঘাত হেনেছিলেন... নেতাজি কখনও আমাদের থেকে দূরে যেতে পারেন না। তিনি আমাদের হৃদয়ে।"
— অটল বিহারী বাজপেয়ী, নেতাজির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভাষণ, ১৯৯৭ এই ভাষণ শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নয়; এটি ভারতের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতাজি সম্পর্কিত মূল্যায়ন।
অটল বিহারী বাজপেয়ী নেতাজিকে কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে দেখেননি। তিনি তাঁকে দেশপ্রেমের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, অতুলনীয় জননায়ক, আত্মত্যাগের প্রতীক এবং ভারতীয় শক্তিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত করা এক ঐতিহাসিক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষায়, নেতাজির গৌরব সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হবে, এবং জাতীয় জীবনে তাঁকে তাঁর যথার্থ মর্যাদা দিতে হবে। যখন একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেতাজিকে জাতীয় গৌরব হিসেবে স্মরণ করেন, আজ, সেই রাজনৈতিক দলেরই রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায় (অনন্ত মহারাজ)-এর নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বহু ইতিহাসবিদ, গবেষক ও নাগরিক এই মন্তব্যগুলিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছেন। নেতাজি বিষয়ক গবেষক, বেশ কয়েকজন গবেষক তাঁদের প্রতিবাদ জানানোর জন্য বৈঠক করেছেন এবং অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। এই বৈপরীত্য শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি ইতিহাসের সঙ্গে সংঘাত।
কিন্তু আজ, একই রাজনৈতিক দলের রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায় (অনন্ত মহারাজ) নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন, যা দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বহু ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সচেতন নাগরিক। তাঁদের বক্তব্য, এই মন্তব্যগুলি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গবেষণা ও দলিলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একদিকে অটল বিহারী বাজপেয়ী বলছেন, নেতাজি ভারতীয় সৈন্যদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদের শিকড়ে আঘাত করেছিলেন। অন্যদিকে আজ এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, যা আজাদ হিন্দ ফৌজের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
এই ধরনের মন্তব্য শুধু নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিকে আঘাত করে না, এটি আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই অসংখ্য সৈনিকের আত্মত্যাগকেও অবমূল্যায়ন করে, যাঁদের সংগ্রাম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বহু , নেতাজি গবেষকের মূল্যায়ন এবং তাদের মতে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই অবস্থান সেই ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা একসময় একই রাজনৈতিক দলেরই অন্যতম শ্রদ্ধেয় নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রকাশ্যে ব্যক্ত করেছিলেন। নেতাজিকে ছোট করার চেষ্টা করে ইতিহাসকে ছোট করা যায় না। আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দলিল, গবেষণা এবং ইতিহাসের সত্যকে মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসের আদালতে রাজনৈতিক বক্তব্যের নয়, প্রমাণের মূল্য থাকে। নেতাজি অনুরাগীদের একাংশ হতাশ কারণ, বিষয়টি নিয়ে মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম এবং প্রিন্ট মিডিয়ার কভারেজ তুলনামূলকভাবে সীমিত। যদিও কিছু আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্র বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে এবং বিতর্কটি সামনে এনেছে, তবু জাতীয় পর্যায়ে যে মাত্রার আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা চোখে পড়েনি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর এই বিতর্ক সামনে এলেও, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে নগেন রায় (অনন্ত মহারাজ)-এর মন্তব্য সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, প্রত্যাহার, নিন্দা বা দলের সরকারি অবস্থান প্রকাশ্যে জানা যায়নি। অন্তত জনসমক্ষে এমন কোনো বিবৃতি সামনে আসেনি। এই নীরবতা স্বাভাবিকভাবেই বহু নেতাজি-অনুরাগী, গবেষক এবং ইতিহাসসচেতন নাগরিকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।