ডানকুনির প্রায় চার দশকের পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রী রামকৃষ্ণ শিশুতীর্থের একটি ভবনে ‘ভূত দেখা গিয়েছে’, এই দাবি করে একটি ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া এবং হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ছবিটি বাস্তব নয়, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাদের মনে হয়েছে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তৈরি। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে বেছে নিয়েছে উল্টো পথ, ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে পড়ুয়াদের যুক্তিবাদী হতে বলা এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সহযোগিতায় একটি বিশেষ বিজ্ঞানমনস্কতা শিবিরের আয়োজন।
কী ছড়িয়েছে ?
ভাইরাল ছবি ও ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, বিদ্যালয়ের একটি ভবনে ‘অতিপ্রাকৃত’ কিছুর উপস্থিতি রয়েছে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, নবম, দশম ও একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যেও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিষয়টি ঘুরছিল। বহু অভিভাবক বিদ্যালয়ে ফোন করে ছবিটির সত্যতা জানতে চান।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে ?
The Views Express-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যালয়ের টিচার-ইন-চার্জ শ্রীমতী সোমা কোলে জানান, কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এবং ভাইরাল ছবি ও ভিডিওটি খতিয়ে দেখেছেন। তাঁর দাবি, অভিভাবকদের অনেকেই শুধু সত্যতা জানতেই চাননি, এই ধরনের অপপ্রচারের প্রতিবাদও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভাইরাল ছবির সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রকৃত ঋদ্ধিভবনের একাধিক ‘মিসম্যাচ’ ধরা পড়েছে, নামফলকের লেখা ও বানান: ‘শ্রী রামকৃষ্ণ শিশুতীর্থ’, ‘রামকৃষ্ণ’, ‘নার্সারি’ ও ‘প্রাথমিক বিভাগ’ এই লেখাগুলির বানান ও বিন্যাসে অসঙ্গতি রয়েছে। অক্ষরবিন্যাস: বিশেষ করে ‘প্রাথমিক বিভাগ’ লেখার ধরনে অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ছে। স্থাপত্যগত পার্থক্য: প্রকৃত ভবনে যে স্লাইডিং জানলা রয়েছে, ভাইরাল ছবিতে দেখা জানলার গঠনের সঙ্গে তার মিল নেই। এই একাধিক অসঙ্গতির ভিত্তিতেই ছবিটি AI-নির্মিত বলে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ। বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির সদস্য অরিজিৎ পোল্লে-র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও টিআইসি-র বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য জানান। ভাইরাল ছবি ও বাস্তব ভবনের মধ্যে থাকা অসঙ্গতির প্রসঙ্গ তাঁর বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
ভয় নয়, প্রশ্ন করতে শেখানো !
ঘটনার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিভিন্ন ক্লাসে গিয়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভয় না পেয়ে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বলা হয়েছে, যাচাই না করে কোনও ছবি বা ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনও মাধ্যমে যেন শেয়ার না করা হয়। কর্তৃপক্ষের বার্তা, প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা যেন শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে; ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে তথ্য যাচাই করে তার প্রতিবাদ করাও একজন সচেতন পড়ুয়ার দায়িত্ব। সোমা কোলে জানান, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ বিজ্ঞানমনস্কতা ও সচেতনতা শিবির আয়োজিত হবে। কুসংস্কারমুক্ত চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।
থানায় জানানো হয়েছে !
টিআইসি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ডানকুনি থানাকে টেলিফোনে ইতিমধ্যেই অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনে ডানকুনি থানা ও সাইবার ক্রাইম শাখায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে।
আইন কী বলছে ?
দেশজুড়ে AI দিয়ে তৈরি ভুয়ো ছবি-ভিডিও ঠেকাতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই কেন্দ্রীয় সরকার নতুন আইটি বিধি কার্যকর করেছে। সেই কাঠামো মাঠপর্যায়ে কতটা কাজে আসে, ডানকুনির এই ঘটনা তার একটি পরীক্ষা। AI দিয়ে তৈরি ভুয়ো ছবি-ভিডিও ঠেকাতে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের নতুন আইটি সংশোধনী বিধি চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। মূল তিনটি শর্ত:-
কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা ভিডিও প্ল্যাটফর্মকে স্পষ্টভাবে লেবেল করতে হবে
সেই লেবেল বা মেটাডেটা মুছে ফেলা যাবে না
বৈধ অভিযোগ পেলে কনটেন্ট সরাতে হবে তিন ঘণ্টার মধ্যে
ফলে ছবিটি AI-নির্মিত প্রমাণিত হলে দ্রুত অপসারণের আইনি পথ এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট। তবে এই নির্দিষ্ট ছবিটি ওই বিধির আওতায় পড়ে কি না, তা ঠিক করবে তদন্তকারী সংস্থা।
কারা, কেন, যা এখনও অজানা !
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন দু’টি: ছবিটি কে বানাল, আর কেন?
অভিভাবক ও প্রাক্তন পড়ুয়াদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে ‘ষড়যন্ত্র’ এবং বিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন। বিদ্যালয়ে ফোন করে তাঁদের অনেকেই এই অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। টিচার-ইন-চার্জ সোমা কোলেও মনে করেন, ঘটনাটি নিছক কৌতুক না-ও হতে পারে—এর পিছনে অপপ্রচার এবং বিদ্যালয়ের বদনাম করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা থেকে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম করেননি এবং জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে তদন্ত ও প্রযুক্তিগত যাচাই প্রয়োজন। এখনও পর্যন্ত এই দুই প্রশ্নের কোনওটিরই উত্তর নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তদন্ত ছাড়া কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তোলা যায় না। তবে দেশ-বিদেশে এই ধরনের ‘হন্টেড’ কনটেন্ট ছড়ানোর পিছনে সাধারণত যে কারণগুলি দেখা যায়, সেগুলি হল:-
ভিউ ও ফলোয়ারের লোভ: ‘হরর’ বা ‘হন্টেড প্লেস’ কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়; অনেক পেজ পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নাগাল বাড়ায়।
নিছক কৌতুক বা চ্যালেঞ্জ: সহজলভ্য AI টুল দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে ছবি বানিয়ে ‘মজা’ করার প্রবণতা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানের সুনামে আঘাত: ভর্তির মরশুমে বা প্রতিযোগিতার পরিসরে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যেও এমন কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগ অতীতে উঠেছে।
উপরের কোনওটিই এই ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে প্রমাণিত নয়। ছবিটির উৎস, প্রথম কে পোস্ট করেছিল এবং কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছড়িয়েছে তা নির্ধারণ করতে পারে একমাত্র তদন্ত ও প্রযুক্তিগত যাচাই।
যাচাইয়ের জায়গাটা কোথায় ?
এখনও পর্যন্ত কোনও প্রযুক্তিগত পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ছবিটি AI-নির্মিত কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানার সময় এখনও আসেনি। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অসঙ্গতিগুলি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পর্যবেক্ষণভিত্তিক দাবি।
পাঠকের জন্য: সন্দেহজনক ছবি পেলে কী করবেন !
ছবিটি সঙ্গে সঙ্গে ফরওয়ার্ড করবেন না।
লেখা, বানান, সাইনবোর্ড, হাত-আঙুল, জানলা-দরজার গঠন এই জায়গাগুলিতে অসঙ্গতি খুঁজুন। AI-নির্মিত ছবিতে লেখা ও পুনরাবৃত্ত জ্যামিতিক গঠনে সবচেয়ে বেশি ভুল থাকে।
রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখুন ছবিটি আগে কোথাও ব্যবহৃত হয়েছে কি না।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি জানতে চান।
বিভ্রান্তিকর মনে হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন এবং প্রয়োজনে স্থানীয় থানা বা সাইবার ক্রাইম শাখায় জানান।
চার দশকের প্রতিষ্ঠান
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রায় চার দশক ধরে ডানকুনি ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রী রামকৃষ্ণ শিশুতীর্থের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের পাঠক্রম অনুসরণ করে পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে নার্সারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। কর্তৃপক্ষের দাবি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রায় প্রতি বছরই বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের নজির হিসেবে স্কুল সূত্রে জানানো হয়েছে, উচ্চমাধ্যমিক ২০২৬: সম্বিত চন্দ্র, দশম স্থান | উচ্চমাধ্যমিক ২০২৫: শ্রেষ্ঠা মুখোপাধ্যায়, অষ্টম স্থান | মাধ্যমিক ২০২৫: শর্মিষ্ঠা ঘোষ, একাদশ স্থান, চলতি বছরের মাধ্যমিকেও বিদ্যালয়ের ছাত্র রাজশেখর মজুমদার মেধাতালিকায় স্থান পেতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে ‘ভূত’-এর মতো চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে অভিভাবক ও প্রাক্তন পড়ুয়াদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ঘটনার শেষ কথাটা অবশ্য ভয়ের নয়। বিদ্যালয়ের বার্তা আপাতত একটাই, প্রশ্ন করো, যাচাই করো, বিজ্ঞানমনস্ক হও।
*The Views Express এই প্রতিবেদনে ভাইরাল ছবি বা ভিডিওটি প্রকাশ করছে না, কারণ তা অযাচাইকৃত এবং তার প্রচার বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে।