Latest News

🌟 WEEKLY WRAP UP 🌟

পৌষমেলা - রূপ ও প্রকাশ

পৌষমেলা - রূপ ও প্রকাশ

লেখক: অধ্যাপক সুজিত কুমার পাল (বিশ্বভারতীর পল্লি সংগঠন বিভাগের গ্রামোন্নয়নের অধ্যাপক)

পৌষমেলার ধারণা ও সূচনাঃ-

 

ঊনবিংশ শতাব্দি নানাবিধ আধ্যাত্মিক আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও তার ঢেউ এসে পড়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আর্য সমাজ, প্রার্থনা সমাজ, থিওসোফিক্যাল সোসাইটি ইত্যাদি। বাংলার বুকেও জন্ম নিল নতুন এক আধ্যাত্মিক চেতনার। তথাকথিত হিন্দু-ধর্মের আচার, নিয়ম ও রীতিকে একপ্রকার বিরোধিতা করে প্রকাশ পেল এক নতুন ধর্ম - ব্রাহ্মধর্ম, ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট উত্তর কোলকাতায়। প্রধান দুই স্তম্ভ হলেন রাজা রামমোহন রায় এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি দ্বারকানাথ ঠাকুর। উদ্দেশ্য ছিল নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ। ১৮৩৩ সালে রাজা রামমোহন রায়ের অকাল মৃত্যুর পর এই ধর্মীয় নবজাগরনের দায়িত্ব নেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ, আর্থিক দায়িত্ব নেন দ্বারকানাথ। এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ), বৃহস্পতিবার বেলা তিনটের সময় রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের থেকে দীক্ষা নেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন আরও কুড়িজন ব্রতী। নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনায় মগ্ন হন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন অবশ্য এই ধর্মের নাম ছিল ‘বেদান্ত প্রতিপাদিত ধর্ম্ম’। ধীরে-ধীরে শিক্ষিত যুবকদের মনে এই ধর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়তে লাগল দেবেন্দ্রনাথ মনে করতেন ব্রাহ্মদের মধ্যে পারস্পরিক সর্ম্পক এই ধর্মের ভীত আরও শক্ত করবে। তাই দীক্ষাগ্রহণের ঠিক দুই বছর পর ১৯৪৫ সালের ২০ ডিসেম্বর, (১৭৬৭ শকাব্দের ৭ই পৌষ) তিনি সকল ব্রাহ্মদের একত্রিত করলেন। এই জমায়েতের মূলত তিনটি উদ্দেশ্য ছিল- ব্রাহ্মদের মধ্যে সাক্ষাৎ, তাদের মধ্যে সদ্ভাব বৃদ্ধি এবং ধার্মিক আলোচনা করা। এই জমায়েতকেই আমরা পৌষমেলার সূচনা বলতে পারি, কারণ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন...

“আমি মনে করিলাম যে, নগরের বাইরের প্রশস্ত ক্ষেত্রে ইঁহাদের প্রতি পৌষ মাসে একটা মেলা হইলে ভাল হয়। সেখানে পরস্পরের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ, সদ্ভাববৃদ্ধি ও ধর্ম্মবিষয়ে আলোচনা হইয়া সকলের উন্নতি হইতে থাকিবে। আমি এই উদ্দেশে ১৭৬৭ শকাব্দের ৭ই পৌষ পলতার পরপারে আমার গোরিটির বাগানে সকলকে নিমন্ত্রণ করি। - ইহাতে ব্রাহ্মদের একটি মহোৎসব হইয়াছিল।

এরপর ধারাবাহিকভাবে যে মেলা প্রতি বছর হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত কোনো তথ্য সেভাবে পাওয়া যায়নি। মেলার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় প্রায় পঞ্চাশ বছর পর।

শান্তিনিকেতন পর্বঃ-

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (তিনি মহর্ষি উপাধী পান ১৮৬৭ সালে কেশবচন্দ্র সেনের ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’-এর থেকে) বোলপুরের কাছে একটি ফাঁকা মাঠে ছাতিম গাছের নীচে তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা উপলব্ধি করেন। পরে ১৮৬৩ সালে ঐ ভুবনডাঙ্গার ফাঁকা মাঠে রায়পুরের জমিদারের থেকে প্রায় কুড়ি বিঘা জমি মৌরসি পাট্টা হিসাবে নেন তিনি। এরপর ঐ ছাতিম গাছের পাশেই তৈরি করেন এক বাড়ি এবং নাম দেন ‘শান্তিনিকেতন’ । এরও প্রায় পঁচিশ বছর পর ১৮৮৮ সালে (১২৯৭ বঙ্গাব্দের ২২ অগ্রহায়ণ) শান্তিনিকেতন গৃহের পাশেই উপাসনার জন্য-‘ব্রহ্মমন্দির’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মন্দির তৈরি হওয়ার পর তা উদ্বোধন হয় ১৮৯১ সালে। ১২৯৮ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ, ওই দিন থেকেই অর্থাৎ ১৮৯১ সালের ৭ই পৌষ থেকে মহর্ষির দীক্ষাগ্রহণের সাম্বৎসরিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। তত্ত্ববোধিনীপত্রিকার প্রতিবেদনে ১৮৯৪ সালের ৭ই পৌষ অনুষ্ঠানকে ‘চতুর্থ সাম্বৎসরিক দিবস’ বলে উল্লেখ করা আছে।

পৌষ মেলার ইতিহাসঃ-

১৮৯১ সালের ৭ই পৌষ দীক্ষাগ্রহণের দিনটি স্মরণ করে পৌষ উৎসবের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু ঐদিন থেকেই মেলার সূচনা হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৮৯৪ সালে। ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার ১৮৯৪ সালের ৭ই পৌষের বর্ণনায় বলা আছে, - “সর্বপ্রথম ঘন্টারব হইল। তখন সকলে ব্রহ্মোপাসনার জন্য প্রস্তুত হইলেন এবং শ্রদ্ধাস্পদ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অগ্রবর্তী করিয়া মঙ্গলগীত গাহিতে গাহিতে মন্দির প্রদিক্ষণ করলেন।...অনন্তর সঙ্গীত হইয়া সভাভঙ্গ হইল। মন্দিরের সোপান পরম্পরায় বহু সংখ্য ভোজ্য সুসজ্জিত ছিল। শ্রদ্ধাসম্পদ রবীন্দ্রবাবু তথায় দন্ডায়মান হইয়া এই বলিয়া ভোজোৎসর্গ করিলেন, ‘অদ্য পৌষ মাসের সপ্তম দিবসে ব্রহ্মপ্রীতি কামনায় এই সমস্ত সবস্ত্র ভোজ্য অনাথ দীন দুঃখী ও আতুরদিগের উদ্দেশ্যে উৎসৃষ্ট হইল”।

ওইদিনই ‘সাধারণের হৃদয়ের সুশিক্ষার জন্য’ “হরিশচন্দ্রের উপাখ্যান (গীতাভিনয়)” অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঐ বছরই মন্দিরের পাশে দোকান পসরা বসা - মেলায় প্রচুর জনসমাগমের কথা উল্লেখ করা আছে। তখন মেলা একদিনই হত - ৭ই পৌষ, ১৯২২ সালে মেলা শুরু হয় দু’দিনের ৭ই এবং ৮ই পৌষ। বাউলদের উপস্থিতি জানা যায় ১৮৯৬ সাল থেকে।

“এ বছর জানা গেল ‘বেলা দু’প্রহরের পর হইতেই উদ্যানে ইতস্তত অনেকগুলি বাউলের দল গোপীযন্ত্র বাজাইয়া ও তালে তালে নৃত্য করিয়া দেহতত্ত্ব প্রভৃতি নানা তত্ত্বগান করিয়া সকলকে মোহিত করিয়াছে”।

১৩০৮ বঙ্গাব্দের (১৯০১ সালে) ৭ই পৌষ রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রয় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার পর থেকেই গুরুদেব তাঁর মতো করে মেলার রূপ প্রদান করেন। বীরভূমের গ্রামীণ শিল্প যেমন মেলার অঙ্গ হয়ে উঠল, তেমনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবাদি বিকিকিনি শুরু হতে থাকে মেলায়। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ শিল্প, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে জগতের সামনে মেলে ধরা। ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এই উদ্দেশ্য আরও সার্থকতা পায়। মহর্ষির দীক্ষাগ্রহণের সম্বাৎসরিক উৎসবের পাশাপাশি গুরুদেবের ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার দিন হিসাবেও ৭ই পৌষের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

অবশ্য মেলার রূপরেখা কেমন হবে তা ঠিক করে দিয়েছিলেন স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৮৮ সালের ৮ মার্চ, (১২৯৪ বঙ্গাব্দের ২৬ ফাল্গুন) শান্তিনিকেতন আশ্রমের জন্য তৈরি হয় অছিপত্র বা Trust Deed, এই দলিলে মহর্ষি মেলার ধরণ এবং নিয়মকানুন উল্লেখ করে গেছেন, -

“নিরাকার এক ব্রহ্মের উপাসনা ব্যতীত কোনো সম্প্রদায় বিশেষের অভীষ্ট দেবতা বা পশু, পক্ষী, মনুষ্যের বা মূর্ত্তির বা চিত্রের বা কোন চিহ্নের পূজা বা হোম যজ্ঞাদি ঐ শান্তিনিকেতনে হইবে না। ... ধর্ম্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্রষ্টীগণ বর্ষে বর্ষে একটি মেলা বসাইবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন। এই মেলাতে সকলে ধর্ম্ম-বিচার ও ধর্ম্মালাপ করিতে পারিবেন। এই মেলায় উৎসবে কোন প্রকার পৌত্তলিক আরাধনা হইবে না ও কুৎসিত আমোদ-উল্লাস হইতে পারিবে না, মদ্য মাংস ব্যতীত এই মেলায় সর্বপ্রকার দ্রব্যাদি খরিদ বিক্রয় হইতে পারিবে। যদি কালে এই মেলার দ্বারা কোন রূপ আয় হয় তবে ট্রষ্টীগণ এই আয়ের টাকা মেলার কিম্বা আশ্রমের উন্নতির জন্য ব্যয় করিবেন”।

এই ডিডের নিয়মমতোই আজও শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট প্রতি বছর এই মেলার আয়োজন করে থাকে। তবে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে কোনোদিন এই শান্তিনিকেতনের মেলা চাক্ষুষ করেননি। কারণ তিনি শেষবার শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন ১৮৮৩ সালে (১২৯০ বঙ্গাব্দে), আর সেই অর্থে মেলার প্রচলন ১৮৯৪ সালে।

৭ই পৌষ ও রবীন্দ্রনাথঃ-

রবীন্দ্রনাথের জীবনে ৭ই পৌষের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গুরুদেবের কথায়- “এই সেই ৭ই পৌষ এই শান্তিনিকেতন আশ্রমকে সৃষ্টি করেছে”। তবে ১৩১৫ বঙ্গাব্দের পৌষ উৎসবে উপাসনার পর তাঁর ‘দীক্ষা’ শীর্ষক বক্তব্যে গুরুদেব ৭ই পৌষের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, -

“একদিন যাঁর চেতনা বিলাসের আরামশয্যা থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছিল - এই পৌষ দিনটি সেই দেবেন্দ্রনাথের দিন। এই দিনটি তিনি আমাদের জন্যে দান করে গিয়েছেন। রত্ন যেমন দান করতে হয় তেমনি করে দান করেছেন। ... সেই সাধকের জীবনের ৭ই পৌষকে আজ উদঘাটন করার দিন, সেই নিয়ে আমরা আজ অনুষ্ঠান করি

পিতার আধ্যাত্মিক চেতনার উপলব্ধি গুরুদেবের মধ্যেও ছিল। পিতার মতো তিনিও আজীবন নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করে গেছেন। পিতার দীক্ষাগ্রহণের দিনটি তাই তিনি পরম শ্রদ্ধায় পালন করেছেন এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। ব্রহ্ম ধর্মের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার জন্যই ব্রহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠার দিন অর্থাৎ ১৮২৮ সালের ২০ আগষ্ট, বুধবার হওয়ার এই বার পবিত্র বলে গণ্য করে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দেন প্রতি বুধবার এবং ওই দিন সাপ্তাহিক উপাসনার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন। রবি-জীবনের বেশিরভাগ ৭ই পৌষ তিনি দীক্ষা সম্বাৎসরিক অনুষ্ঠানে হাজির থাকতেন। যে কয়েকবার বিদেশে থাকার দরুণ তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁর ব্যকুলতা তিনি চিঠিতে প্রকাশ করেছেন। এইরকমই একটি চিঠি আমরা পাই ১৩১৯ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ, আমেরিকার আরবানা থেকে অজিতকুমার চক্রবর্তীকে লেখা। সেই চিঠিতে তিনি লিখলেন,

“আজ ৭ই পৌষ! কাল সন্ধ্যার সময় যখন একলা আমার শোবার ঘরে আলো জ্বালিয়ে বসলুম আমার মধ্যে এমন একটা বেদনা বোধ হতে লাগল সে আমি বলতে পারিনে, সে-বেদনা শরীরের কি মনের তা জানিনে, কিন্তু ব্যকুল করে তুললে”।

আবার ১৩৩১ সালের পৌষ উৎসবেও গুরুদেব উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তাঁর ব্যাকুলতা আবারও প্রকাশ করেন। ওই বছরে মন্দিরে উপাসনা করেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

C. F. Andrews কে লেখা চিঠিতে গুরুদেব লেখেন-

Tomorrow comes 7th Pous. You can not imagine now my heart aches to be with you all. These days are very precious to me - all the more so, because my store of them is fast coming to its final exhaustion. However, tomorrow I shall join your festival from a distance and try to fill my heart with my provision of Shanti."

এইরকমই অনুভূতি ছিল গুরুদেবের। তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা, ঈশ্বরের উপলব্ধি এবং ধর্মীয় অনুভূতি- সবই প্রভাবিত হয়েছিল ৭ই পৌষের ঘটনা পরম্পরাতে। তবে ১৩৪৭ সালে কবি শান্তিনিকেতনে থাকলেও উপাসনায় আসতে পারেননি। আক্ষেপ করে তিনি বলেছেন, -

আমি আশ্রমে উপস্থিত আছি অথচ ৭ই পৌষের উৎসবে আসন গ্রহণ করতে পারিনি এরকম ঘটনা আজ এই প্রথম ঘটল”।

ঘটনাচক্রে এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ ৭ই পৌষ। সুতরাং, তাঁর বক্তব্য এবং অনুভূতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, রবীন্দ্রনাথের-চেতনায় ৭ই পৌষ ছিল শ্রদ্ধার দিন, নিবেদনের দিন, বিশ্বাসের দিন।

পৌষ মেলার প্রকৃতি ও বিবর্তনঃ-

পৌষমেলার সূত্রপাত ১৮৯৪ সাল। এর দুবছর পর থেকেই কলেরব বাড়তে থাকে। প্রথমকালে পৌষ উৎসবের উপাসনা হত মন্দিরে এবং মেলা বসত মন্দিরের চারিপাশে। সেখানে স্থান-সংকুলান হওয়ার জন্য মেলা স্থানান্তরিত হয়ে যায় মন্দিরের উত্তরদিকে ফাঁকা মাঠে, এখন যেটা পুরানো মেলার মাঠ হিসাবে বিখ্যাত। আর নাগরদোলা বসত মন্দির ও ছাতিমতলার মাঝের পরিসরে। তবে উপাসনা ও অনান্য অনুষ্ঠানের সময় নাগরদোলা বন্ধ থাকত। কিন্তু মন্দিরে উপাসনায় ভিড় ক্রমে বাড়তে লাগল এবং কোলাহল বৃদ্ধি পেতে থাকলে পৌষ উৎসব ছাতিম তলায় স্থানান্তরিত করা হয়। বহু পরে চালু হয় মাইক্রোফোনের ব্যবহার।

পৌষমেলার প্রকৃতি ছিল একেবারে গ্রামীণ, গ্রামের মানুষেরা তাদের নিজেদের তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে আসত এবং বিক্রি করত। শান্তিনিকেতন কেন্দ্রিক গ্রামের মানুষেরাই মূলত আসতেন। ধীরে ধীরে মেলার পরিধি বাড়তে লাগল, আবারও সমস্যা হল স্থান-সংকুলান। সম্ভবত ১৯৬১ সালে, পৌষমেলা চলে এল পূর্বপল্লীর মাঠে, যেখানে আজও মেলা হয়। আর একটি পরিবর্তন এল। মেলা দুই দিন থেকে বেড়ে তিন দিন করা হল। পৌষমেলার বিশেষত্ব, যা এই মেলাকে অনান্য মেলা থেকে আলাদা করে রেখেছে, তা হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলার শিল্প ও সাংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে পৌষমেলা। এই মেলায় যেমন বাউল গান, ফকির গান, টুসু গান, ভাদু গান ইত্যাদি হয়, তেমনই হয় সত্যপীরের পাঁচালী, ছৌ-নৃত্য, রায়বেশে, রণপা নৃত্য, সাঁওতালী নাচ ও যাত্রাভিনয়। আগে একটা দিন ধার্য করা থাকত সাঁওতালী অনুষ্ঠানের জন্য। অর্থাৎ বাংলার সাংস্কৃতিক চরিত্রের প্রায় সবদিকই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয় এই মেলায়

অরেকটি চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হল মেলায় সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রভাব। মহর্ষির ইচ্ছামত আজও ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই এই মেলায়। সবার জন্যই অবারিত দ্বার। তাই যেমন ভাদু-গান, টুসু গান হয়, তেমনই ফকির গান, সত্যপীরের পাঁচালী হয়। যেমন মনসামঙ্গল, কীর্তন গান হয়, তেমনই বুদ্ধ কীর্তন হয়।

২০১৭ সাল থেকে মেলা ৬ দিনের হতে শুরু করে, এর অন্যতম কারণ ছিল ভাঙা মেলার প্রথা বন্ধ করা। আগে ৩ দিনের মেলা হলেও ‘ভাঙা মেলার’ জন্য বিক্রেতারা রয়ে যেতেন এবং পরিবেশ দূষণ হত। তাই পরিবেশ বান্ধব মেলার জন্য মেলা ৩ থেকে ৬ দিনের করা হয় এবং ভাঙা মেলার প্রথা বন্ধ করা হয়। মেলা নিয়ে নানা সময়ে নানা বিষয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে, আদালতে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তবু মেলা আজও নিজস্ব ছন্দে, রীতিতে এগিয়ে চলেছে। মহর্ষি প্রণীত সেই ঐতিহ্য আজও সমানভাবে বহমান।

আজকের পৌষমেলাঃ-

১৮৯৪ সালে শুরু হওয়া পৌষমেলা ১৯৯৪ সালে শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। এখন প্রায় ১৩০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই মেলা। তবুও এই মেলার চরিত্রগত ও আদর্শগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজও ৭ই পৌষ মহর্ষির দীক্ষা গ্রহণের সম্বাৎসরিক অনুষ্ঠান বা উপাসনার পর উদ্বোধন হয় পৌষমেলার। আজও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা তুলে ধরেন তাঁদের শিল্পসত্ত্বা। আজও গ্রামীণ শিল্পীরা তাদের পসার নিয়ে বসেন, তুলে ধরেন তাঁদের শিল্পনৈপুণ্য। তবে একথা ঠিক যে, পৌষমেলার গঠনগত কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের দাবী এবং সভ্যতার অগ্রগতিকে অবহেলা করা যাবে না। তারই প্রভাব পড়েছে আজকের পৌষমেলায়। আজ গ্রামীণ শিল্পের পাশে জায়গা করে নিয়েছে বহুজাতিক নামী স্ংস্থা, পণ্যের বিভিন্নতা বেড়েছে। বেড়েছে খাদ্যদ্রব্যের নানাবিধ বাহার।

সামগ্রিক স্টলের সাংখ্যা প্রায় ১৬০০ হয়েছে। বিনোদনের জন্য শিল্পীদের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন ‘রাইড’, এইসবের হাত ধরেই চলে এসেছে কৃত্রিমতা। যার ফলে আজ পৌষ উৎসবের থেকে পৌষমেলা বেশি বিখ্যাত, দর্শনার্থীদের থেকে পর্যটকের সংখ্যা বেশি।

পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, নদীর প্রবাহমান জল যেমন আটকে রাখলে পরবর্তীকালে প্লাবনের আশঙ্কা থাকে, তেমনই পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিতে হয়। তা নাহলে পারে বিকৃত বহিঃপ্রকাশ হাতে পারে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই নতুনকে স্বাগত জানাতে হবে। পৌষমেলার এই গঠনগত পরিবর্তন এই মেলার উদ্দেশ্য বা ঐতিহ্যকে কোনোভাবেই বিঘ্নিত করতে পারবে না। যে পবিত্র অভীপ্সা নিয়ে পৌষমেলার সূত্রপাত, তা নিশ্চিতভাবেই অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং আগামী প্রজন্মকে বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষ্টি সমৃদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে।

 

Writer : Dr. Sujit Kumar Paul,  Professor of Rural Development and Management, Visva-Bharati .

Professor Sujit Kumar Paul is a professor in the Department of Lifelong Learning and Extension at Visva-Bharati University. Professor Paul specializes in teaching and research in rural development. His research is connected with both national and international spheres and is highly acclaimed. He works with the United Nations Organization on sustainable development initiatives.

(Note: The OPINION section of The Views Express presents the articles or columns by individuals, where the writer exclusively writes on the matters of History, International Relations, Politics, Economy, Literature etc. on the basis of his or her opinion, knowledge, research & observations on the subject matter)

Copyright © 2024 The Views Express, All Rights Reserved. Developed by PRIGROW